কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে বই-দেওয়াল বাড়ি

‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত যৌবনা’-মহাকবি ওমর খৈয়ামের কবিতার এই চরণগুলো শাশ্বত। সত্যিই জ্ঞান অন্বেষণের বাহন বই অনন্ত যৌবনা।

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে বই-দেওয়াল বাড়ি

এর প্রৌঢ়ত্ব নেই। তাই অনাদিকাল থেকেই জ্ঞানপিপাসুদের কাছে বইই হচ্ছে অমূল্য সম্পদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক এবং ইউটিউবে ডুবে থাকায় বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে দেখা দিয়েছে সীমাহীন বই বিমুখতা।

এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে তথা বই প্রেম জাগ্রত করতে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে গড়ে তোলা হয়েছে ব্যতিক্রমী এক বইদেয়াল বাড়ি। দৃষ্টিনন্দন এই বই-দেওয়াল বাড়ি দেখতে উৎসুক দর্শনার্থীরা প্রতিদিনই ভিড় করছেন।

জানা যায়, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার সরারচর ইউনিয়নের কালে খাঁ ভাণ্ডা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত শামছুল হক ভূঁইয়া ও তার স্ত্রী ছিলেন বই প্রেমিক। বাবা-মার মতো বই পড়ার অভ্যাস ছেলে রাকিব হাসানেরও।

তাই তিনি নিজে বই পড়ার পাশাপাশি অন্যদের উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি মহান ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি-প্রেক্ষাপটসহ বাঙালি জীবন এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এক অনুকরণীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

স্টিলের পাত দিয়ে তৈরি বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী সব বইয়ের নাম ও মোড়কে সাজিয়েছেন বাড়ির সামনের দেওয়াল। তার এই নান্দনিক আয়োজন ইতোমধ্যেই গোটা এলাকায় সারা জাগিয়েছে।

ওই বইদেয়াল বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষের ভিড়। এ সময় কথা হয় বইদেয়াল বাড়ির মেয়ে বাজিতপুর ডিগ্রি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী প্রমি আক্তারের সঙ্গে।

তিনি জানান, প্রতিদিনই এই বাড়ি দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে কিশোর-কিশোরী এবং তরুণ-তরুণীরা ছুটে আসছেন। আরেক দর্শনার্থী সমাজকর্মী স্বাধীন আহমেদ বলেন, বই বিমুখতা দূর করতে এমন অনন্য উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে।

কিশোরগঞ্জ-ভৈরব রেলপথের সন্নিকটে অবস্থিত আনন্দধারা নামের ছবির মতো এই বইদেয়াল বাড়িটি এখন আসা-যাওয়ার পথে ট্রেন যাত্রীদেরও দৃষ্টি কাড়ে। দৃষ্টিনন্দন গেইট মাড়িয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা হয় অশীতিপর বৃদ্ধা শামসুন্নাহার বেগমের সঙ্গে।

তিনি রাকিব হাসানের মা এবং বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসার প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা শামছুল হক ভূঁইয়ার স্ত্রী। প্রথম যখন ঢাকায় বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয় তখন অন্য দুই সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তার সঙ্গে সেই পতাকাকে স্যালুট দিয়ে তার স্বামী (রাকিব হাসানের বাবা) মুক্তিযুদ্ধে চলে যান।

যুদ্ধ শেষে বীরের বেশে বাড়ি ফিরে আসেন তিনি। ২০১৪ সালে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু হয়। তিন ছেলে ও তিন মেয়ে রেখে যান। আলাপকালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শামসুন্নাহার বেগম বলেন, মুক্তিযুদ্ধ তো সেই কবে শেষ হয়েছে।

কিন্তু সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং উদ্দেশ্যতো আজও বাস্তবায়িত হয়নি। ছোট ছেলে রাকিব হাসানতো মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। তবে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসাবে মহান মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন এবং বাঙালি জাতির ইতিহাস সম্পর্কে নিজে জানার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে সে বাড়ির দেওয়ালটি বিখ্যাত সব বইয়ের প্রচ্ছদ দিয়ে সাজাচ্ছে। এসব নিয়ে রাকিবের ভাবনার যেন অন্ত নেই। 

এ সময় বইদেয়াল বাড়ির নির্মাতা ঢাকার একটি বেসরকারি সংস্থার উপমহাব্যবস্থাপক রাকিব হাসান বাড়িতে ছিলেন না। তবে মা শামসুন্নাহার বেগম জানান, ঘণ্টাখানিকের মধ্যেই রাকিব ঢাকা থেকে বাড়ি পৌঁছাতে পারে।

তাই এবার রাকিবের জন্য অপেক্ষার পালা। অবশেষে প্রায় দুই ঘণ্টা পর রাত ৭টার দিকে রাকিব হাসান বাড়িতে পৌঁছেন। গাড়ি থেকে নেমেই বই-দেওয়াল বাড়ির নির্মাণের আদ্যোপান্ত জানাতে শুরু করেন।

বলেন, আমরা কেউ মহান ভাষা আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। কিন্তু এসব ইতিহাস পড়ার কারণে আমাদের চোখের সামনে মহান ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি মূর্ত হয়ে ওঠে।

ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার অভ্যাস তার। একটি বই সংগ্রহ করে পড়তে তিনি মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুক, ইউটিউব ইত্যাদি কারণে বর্তমান প্রজন্মের কাছে এক ধরনের বই বিমুখতা দেখা দিয়েছে।

তাদের ভাবনাতেই যেন নেই মহান মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা এবং বাঙালি জীবন ও সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে কালজয়ী সব বইয়ের নাম। অথচ একজন মানুষের প্রকৃত বন্ধু হচ্ছে বই।

একজন বন্ধু ছেড়ে যেতে পারে, কিন্তু বই সারাজীবন বাতিঘর হয়ে পথ দেখিয়ে যায়। তাই নতুন প্রজন্মকে এসব বই পড়ার এবং বাঙালির জীবন ও সংগ্রামের ইতিহাস জানার প্রতি আগ্রহী করে গড়ে তোলার চেষ্টায় তিনি বইদেয়াল বাড়ি নির্মাণের উদ্যোগ নেন।

এই বাড়ি পরিদর্শন করে বই পড়ার চেতনা ফিরে এলে তার প্রয়াস সার্থক ও সফল হবে। বাড়িতে কালজয়ী বইয়ের একটি লাইব্রেরি গড়ে তোলারও ইচ্ছা আছে তার।